Bangla StoryStory (Writer)

বাসরঘরে সিসি ক্যামেরা

বাসরঘরে সিসি ক্যামেরা

মামাতো ভাইয়ের বাসরঘরে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে ওর আর ওর বউয়ের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করা হবে।। এটা শুনতে বেশ খারাপ বা বেমানান লাগলেও, এতে আমার মামা মামী, আব্বু আম্মু সহ প্রায় সব মুরব্বিদের সম্মতি আছে।। আপনাদের ভেবে অবাক লাগছে, তবে খুলেই বলি- আমার দুই মামা আর এক খালা!!
বড় মামার একটা মাত্র ছেলে আর ছোট মামার দুই মেয়ে।। আমার বড় মামার ছেলের নাম আদিল।। আদিল দেখতে বেশ সুদর্শন, ছেলে মানুষদের মধ্যে যদি কখনো সুন্দরের প্রতিযোগীতা হয় তবে আদিল অনায়াসে সেরা দশের একজন হবে।। আদিলের বয়স কত হবে ২৫-২৬ এর মত।। আসলে শুরুতে যে বাসর ঘরে ক্যামেরা লাগানোর কথা বললাম, সেটা করার পিছনে অন্য একটা কারণ আছে।। আর, কারণটা হলো- আদিল সুস্থ্য স্বাভাবিক কোন মানুষ না, সে একজন মানসিক প্রতিবন্ধী।। কিন্তু বদ্ধ উন্মাদ নয়।। জন্মের পর থেকে তার মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা দেখা যায় নি, একদম স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতই তার উঠা-বসা, চলা-ফেরা ছিলো।। কিন্তু ৯ বছর বয়সে একবার তার টাইফয়েড হয়, মামারা আজীবন গ্রামেই কাটিয়ে দিলো- সে সময় আদিলের টাইফয়েটের ব্যাপারটা তারা ধরতে পারে নি।। যতদিনে ডাক্তার কাছে গেলো, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।। আদিলের বাঁচার সম্ভবনা প্রায় ছিলোই না, কিন্তু অলৌকিকভাবে সে বেঁচে গেলো, কিন্তু তার আর স্বাভাবিক বুদ্ধির বিকাশ ঘটে নি।। আদিল এখনো সেই নয় বছরের বাচ্চাদের মতই হয়ে আছে, তাকে দেখে আপনি হয়তো বুঝতে পারবেন না।। কিন্তু তার সাথে মিশলে, কথা বার্তা বললে বুঝে যাবেন- ছেলেটার আচরণ বয়সের তুলনায় খুব অস্বাভাবিক!! মামা আরো সন্তান নেয়ার চেস্টা করেছে লাভ হয় নি, মামীর জড়ায়ু ক্যান্সারের পর সে সম্ভবনাও শেষ হয়ে যায়।। আবার যে বিয়ে করবেন এমন কিছু আমার বড় মামা কোনদিন ভাবে নি।। সে উপরওয়ালার দয়ার দিকে চেয়ে আছে, মামার বিশ্বাস- তার ছেলে হয়তো একদিন সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।। কিন্তু, দিন গড়িয়ে যুগ পেরিয়ে গেলো- মামার আশা পূরণ হলো না।। মামা মামীর বয়স হয়েছে, তারা এখন মরণের ভয় পায়।। এই বংশে আদিল একমাত্র ছেলে, আর সেই ছেলেও কিনা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী।। মামা দূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এর ওর সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলো, আদিলকে বিয়ে করাবে।। লোকে নাকি এমন অনেক পাগল দেখেছে যারা বিয়ের পর ভালো হয়ে গেছে।। এমন অক্ষম ছেলেকে বিয়ে করানো মুখের কথা না, কেউ একজন মামাকে পরামর্শ দিলো- যেনো মামা এমন একজন মেয়ে খুঁজে যে কিনা আদিলের মতই মানসিক প্রতিবন্ধী।। পাগলে পাগলে নাকি একবার মিল হলে সেই বন্ধন আজীবন অটুট থাকে।। আমরা যেমন ভালো মানুষে, মানুষে মিলে মিশে থাকি।। দুই পাগল মিলেও নাকি এমন সংসার করা সম্ভব, পাগলে বুঝে পাগলের ভাষা।।
আর, দুই পাগলের ঘর থেকে প্রাপ্ত সন্তান যে পাগল হবে এমন কোন কথা নেই- মেডিকেল সাইন্স অনুযায়ী অবশ্যই তারাও সুস্থ্য বাচ্চা জন্ম দিতে পারে।। মামা এবার সাহস করে একটা ঝুঁকি নিলেন, সে দশ গ্রাম ঘুরে এমনি এক প্রতিবন্ধী মেয়ের সন্ধান পেলেন, মেয়ের নাম ফুলবানু!! মেয়েটার চেহারায়ও একটু এবনরমাল ভাব আছে, আমি যেদিন এই ফুলবানুকে দেখি সেদিন অবাক হয়ে যাই- কারণ মেয়েটার নাকে এবং কপালে দুইটা তিল আছে।। মজার ব্যাপার প্রায় একই জায়গায় আমার নিজেরও তিল আছে।। শুরুতে মামার সিদ্ধান্তের অনেকেই বিরোধিতা করে, কিন্তু মামা বংশ রক্ষার্থে আর কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে এই কাজ করার জন্যে বদ্ধ পরিকর।। আস্তে আস্তে লোকজন যখন দেখলো- না এই ঘাওড়া লোককে বুঝানো সম্ভব না তখন তারাও আস্তে আস্তে মামার তালে তাল মিলালো।।

ফুলবানুরা দুই বোন, ফুলবানুর সাথে আদিলের বিয়ে হলে ফুলবানুর ছোট বোন তারাবানু হবে আমার বিয়াইন।। মেয়েটা দেখতে খুব সাধারণ, এক দেখাতেই বুঝা যায় এটা গ্রামের মেয়ে।। কিন্তু আমি শহরে থাকি বিধায় ভেবেই নিয়েছি এই মেয়েকে নিয়ে একটু হাসি তামাশা মজা করা যাবে।। নামের ব্যাপারে আমার ভীষণ এলার্জি, আমার নানী দাদীর নামও মনে হয় এর চেয়ে আধুনিক ছিলো।। ফুলবানু নাকি জন্ম থেকেই এমন মানসিক প্রতিবন্ধী।। কিন্তু তারাবানুর কোন সমস্যা নেই- সে দিব্যি সুস্থ্য।। এবার সে এলাসিন কলেজে ইন্টার পড়ছে, সামনে পরীক্ষা।। আমার তুলনায় বয়সে বাচ্চা মেয়ে হলেও, গ্রামের মেয়েরা সাধারণত পড়াশোনায় একটু পিছিয়েই থাকে।। তাই তারাবানুকে দেখে অনার্স পড়ুয়া মেয়ে ভেবে নিতে কারো আপত্তি থাকবে না।। আমার কোন ভাই নেই, ছোট দুই বোন আছে নাম বিন্তি মিন্তি।। ওরা জমজ!! তাই নানাভাই মিলিয়ে ঝিলিয়ে নাম রেখেছে।। ওরা এখন তারাবানুর মতই ইন্টারে পড়ে।।

সিসি ক্যামেরার ব্যাপারগুলো কেউ তেমন বুঝে না।। আমি নিজে টাংগাইল গিয়ে ভালোমানের দুইটা সিসি ক্যামেরা কিনে নিয়ে এলাম।। লোকজন দিয়ে সেগুলো রুমে ফিট করলাম, মামা বলেছিলো একটা হলেই হবে।। আমি একটু অগ্রিম চিন্তা করে দুটো নিয়ে এসেছি।। মনিটরিংয়ের কাজ করবো আমার ল্যাপটপে।। সিসি ক্যামেরা লাগাতে যত খরচ সব মামা দিয়েছে, টাকা একটু বেশিই দিয়েছে- তাতে আমার পকেটে ফাউ প্রায় আড়াই হাজার টাকার মত ঢুকলো।। গ্রামের বাড়িতে এইসব সিসি ক্যামেরা সেট করা বেশ ঝামেলা, তবুও সব কাজ ভালোভাবেই সম্পন্ন হলো!!

………
বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা মেয়ে তুলে আনতে এলাসিন গেলাম।। সেখানে এক বয়স্ক লোকের সাথে পরিচয় হলো।। সে ফুলবানুর চাচাতো চাচা- লোকটা আমাকে ডেকে নিয়ে বলে- বাবা তোমার নাম কি?

আমি বললাম- শোভন!!

উনি ভ্রু কুঁচকে বললেন- আহা বাবা পুরো নাম বলো?

আমার নাম বেশ বড়, আমি সাধারণত কেউ জিজ্ঞেস করলে অর্ধেক বলি, উনাকে আমি বললাম- রাজভী রায়হান শোভন!!

উনি একটু চিন্তা করে বললেন- আচ্ছা তাহলে আমি তোমাকে রারাশো বলে ডাকবো।।

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম- মানে কি আংকেল? রারাশো আবার কি?

উনি হেসে বললেন- পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রুপ।। মজা না বলো?

আমি ভাবলাম, পাগল নাকি এই লোক, এই ফ্যামেলিতে দেখা যাবে পাগলের ছড়াছড়ি।। আমি সেখান থেকে আর কিছু কথা বলে পাশ কাটিয়ে সরে এলাম।।

আমার কপাল খারাপ, খাবার টেবিলে সেই লোক আমার পাশে বসছে।। আমার আরেক পাশে খালাতো ভাই মাসুদ বসা।।

সেই লোক আমাকে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করে- ওই ছেলে তোমার কি হয়? মাসুদকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো!!

মাসুদ তখন এক নাগাড়ে খেয়ে যাচ্ছে।। আমি মাসুদ আর এই লোকের মাঝে বসা।।

আমি আস্তে করে বললাম- ও আমার খালাতো ভাই? বড় খালার ছেলে?

লোকটা কৌতূহল নিয়ে বললো- আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দাও, ওর নাম কি?

আমি এবার একটু ভেবে বললাম- মাসুদ গিয়াস!!
লোকটা এবার খানিক ভেবে, কিছু একটা বলতে গিয়ে আর বললো না।। উনি খাবারে মন দিলেন।।

আমি একটা লুকানো অসভ্য হাসি হেসে চলছি।। আসলে মাসুদের নাম সাইফুল আলম মাসুদ কিন্তু এই আধ পাগলটাকে শিক্ষা দেবার জন্যে বলেছি মাসুদ গিয়াস!!

মেয়ের বাড়ি থেকে বউ উঠিয়ে আনতে আনতে রাত নয়টা বেজে গেলো।। মজার ব্যাপার ফুলবানুর সাথে ওর নানী আর তারাবানুও আসছে।। আদিল কোন ঝামেলাই করলো না, সে বিয়েতে মজা পাচ্ছে।। এমনকি তাকে যে জামাই সাজিয়ে দেয়া হয়েছে, এতে সে খুব খুশি।। এই পোশাক নাকি সে আজীবন গায়ে দিয়ে থাকবে।। এটা খুলার কোন ইচ্ছে তার নেই, আমরা আত্মীয়-স্বজনরা এটা নিয়েই বেশ হাসাহাসি করলাম।।
একে একে বাড়িতে সব রীতি রেওয়াজ পালন করার পর, বাসর ঘরের পালা এলো।। কারা কারা সিসি ক্যামেরায় বাসর ঘর পর্যবেক্ষণ করবে এর একটা তালিকা মনে মনে করাই আছে।। ল্যাপটপের সামনে বড় মামা মামী, ছোট মামা মামী, আব্বু আম্মু আর আমি থাকবো!! ফুলবানুদের বাড়ি থেকে আসা লোকজন এইসব কান্ড কারখানার কথা জানে না।। মামী বলে আমরা দেখবো ওরা আসলে আবার মারামারি করে কিনা, আর যদি দেখি- না নিজেরা মিল মহব্বত করে কিছু করতেছে, তাইলে ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয়া হবে।। এটা নিয়ে কারো কোন আপত্তি নেই, আমাদের সবার বিশ্বাস ওরা যেহেতু দুজনেই মানসিক প্রতিবন্ধী, আজ রাতে সহবাস জাতীয় কিছু ঘটার কোন সম্ভবনা নেই।। তবে সমস্যা নেই, আজ না হোক আস্তে আস্তে ওদের বুঝানো যাবে, আপাতত বিয়েটা তো হলো।। আমি আছি আরেক যন্ত্রনায়, তারাবানুর মত গ্রামের সাধাসিধে মেয়েটাও আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না।। কি জ্বালা!!

আইপি ক্যামেরার মাধ্যমে আমি ঘরের সব দেখছি।। ঘরের ভিতর ফুলবানুর নানী আর তারাবানু বসে আছে, সাথে আছে বউ সাজে ফুলবানু।। ক্যামেরাগুলো সিলিংয়ের উপরে এমন ভাবে লাগানো, যাতে সহজে ক্যামেরা দেখা না যায়।। মামী আদিলের শরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বার বার দোয়া কালাম পড়ে ফুঁ দিচ্ছে, আমি অন্য রুমে আব্বু আম্মুকে নিয়ে বসে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছি।। মামা কি একটা কাজ নিয়ে যেনো, আপাতত ব্যাস্ত।। ছোট মামা মামী সেই কখন থেকে বসে আছে।। এটা সবার জন্যে এক নতুন অভিজ্ঞতা, আসলে এছাড়া কোন উপায় ছিলো না।। শুনতে বা ভাবতে বাজে শুনালেও এটা মোটেই কোন বাজে উদ্দেশ্য নিয়ে করা না।। আমার ছোট দুই বোন খুব অনুরোধ করেছিলো, কিন্তু আব্বু আম্মু পারমিশন দেয় নি মনিটরের সামনে থাকার।।

মামী আস্তে আস্তে বাসর ঘরে আদিলকে নিয়ে গেলো।। বাসর ঘরের ভিতর এখন পাঁচজন মানুষ।। বউ ফুলবানু, তারাবানু, ওদের নানী, আদিল আর মামী।। তারা কি সব কথা বার্তা বলে কি যেনো বুঝাচ্ছে, ক্যামেরাতে সাউন্ড ক্যাপচার করার এমআইসি আছে, চাইলে আমি অডিও শুনতে পারবো কিন্তু ইচ্ছে করেই অডিও মিউট করে রাখা।। মিনিট দশের পরে, আদিল আর ফুলবানুকে রেখে বাকী তিনজন রুম থেকে বেরিয়ে এলো।। ওই রুমের দরজা আর আমাদের রুমের দরজা মাঝামাঝি।। তাই মামীকে দেখলাম বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিলো।। তারাবানু আর ওর নানু আমাদের দিকে আসতে নিয়েছে, এমন সময় আমি দ্রুত মনিটরিং স্ক্রিন অফ করে সোজা ডেক্সটপে এনে রাখলাম।। কিন্তু ভাগ্য ভালো, কোন ঝামেলা হলো না- এদের দুইজনের এদিকে আসাকে বাঁধা দিয়ে বড় মামী উনাদের অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিলো!! মামা আসলে বিয়েতে খুব বেশি মানুষ দাওয়াত করে নি, মামার ইচ্ছে তার বৌমার যখন বাচ্চা হবে- তখন সে এত বড় আয়োজন করবে, যাতে সারা গ্রামবাসী যেনো তাক লেগে যায়।। তাই বিয়ে বাড়ি হলেও, লোকের আধিক্য বেশ কম।। এই অল্প কিছু নিজেদের মানুষ আর কি!!

আদিল খাটের এক কোণায় বসে আছে।। ফুলবানু বিছানায় শুয়ে পড়েছে।। আদিলকে দেখে মনে হচ্ছে, সে এখন বিছনায় শুতে পারলে শান্তি পেতো।। কিন্তু কেনো যেনো সাহস পাচ্ছে না।। আদিল খুব বিক্ষিপ্ত ভাবে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে ওর বিছানায় অন্য কেউ শুয়ে আছে এটা সে মেনে নিতে পারছে না।। হঠাৎ আদিল কি যেনো বললো, আমি অডিও অন করে দিলাম।। কিন্তু বেশ বাজে সাউন্ড ইফেক্ট শোনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে ল্যাপটপের স্পিকার ফেটে যাবে।। আমি দ্রুত অডিও মিউট করে এয়ারফোন ঢুকালাম।। মনিটরের সামনে বসা সবাইকেই বললাম, কি কথা হয় আমি শুনবো নে, পরে আপনাদের বলুম।। আপাতত সাউন্ড এই বক্সে দিলে কিছুই শোনা যাবে না।। সবাই অনিচ্ছা স্বত্বেও রাজী হলো।। কারন একটু আগে তারা শুনেছে কেমন বাজে সাউন্ড হচ্ছিলো।।

আদিল হঠাৎ হাত দিয়ে তার বউকে ধাক্কাছে।। আদিলের বউ আদিলকে একটা লাত্থি মারলো।। মামী সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়লো, সে সোজা বাসর ঘরের দিকে হাঁটা দিয়েছে দেখলাম।। মামা দ্রুত উঠে গিয়ে মামীকে হাত টেনে নিয়ে আসলো।। মামী সরাসরি সবার সামনে বলে উঠলো- মাগীর কত বড় সাহস, আমার পুলারে লাত্থি মারে।। আমার কানে এয়ারফোন ছিলো, আমি খুলে মামীর কান্ড কারখানা দেখে যাচ্ছি।। মামা কড়া একটা ধমক দিয়ে মামীকে থামিয়ে দিলো।। ওদিকে বাসর ঘরে কেউ কোন কথা বলছে না।। পুরো মনিটরে ক্যামেরা ওয়ানের স্ক্রিন দেয়া।। আমি ভাবলাম অযথাই দুইটা ক্যামেরা আনলাম, একটা ক্যামেরাই যথেষ্ট ছিলো!!

আদিল লাথি খেয়ে চুপ করে বসে আছে।। বেচারা একটু পর, ফ্লোরে গিয়ে শুয়ে পড়লো!! ফ্লোরে কার্পেট বিছানো, বিয়ে উপলক্ষ্যে শুধু বাসর ঘরে কার্পেট দেয়া হয়েছে।। সেখানে বালিশ বিহীন, সোজা মাথার নিচে হাত দিয়ে আদিল সটান পরে রইলো।। আমরা আসলে কি দেখব, কি দেখার আশায় আছি নিজেরাও জানি না।। এভাবেই চলছে, মামী আরো বেশ কয়েকবার শরীর এঁকিয়ে বেকিয়ে উঠে যেতে চেয়েছে কিন্তু প্রতিবার মামার কড়া চোখ রাঙ্গানিতে মামী আর সাহস করে উঠতে পারে নি।।
হঠাৎ করে, আদিল শোয়া থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো, সোজা তরতর করে বিছানায় গিয়ে ফুলবানুকে এলোপাথারি মারছে।। ফুলবানুও পাল্টা আক্রমণ করছে।। আমি এয়ারফোন কানে নিলাম কথা শোনার জন্যে।। এবার ছোট মামা উঠতে যাচ্ছিলো বাসর ঘরের দিকে, কিন্তু বড় মামা বললো- ওরা জামাই বউ যা খুশি করুক তগো কি!! চুপ মাইরা বইসা থাক, নইলে যা ঘুমা তোরা!! আমি একাই দেখুম!!
আম্মু শুধু অস্ফুট কন্ঠে বড় মামাকে উদ্দেশ্য করে বললো- মিয়া ভাই, মারামারি থামানো দরকার না।।
আমি বাইরের কথা শুনতে চাইলে, একবার এয়ারফোন খুলি একবার লাগাই।।

ভিতরে তুমুল মারামারি চলছে, ওদের মারামারির বিষয় বিছানায় শোয়া নিয়ে।। মানে হচ্ছে- ওরা কেউ বিছানা শেয়ার করবে না।। আদিল বলছে এটা আমার বিছানা, তুই ক্যারা, তুই যা ভাগ আর ফুলবানুর যুক্তি তার নানী বলছে এইডা তার বিছানা!! আদিল মাঝে মাঝে মা মা করে মামীকে ডাকছে, মামী তো আর জানে না নইলে সে সব ফেলে বাসর ঘরের দিকে দৌড় দিতো!! আদিল আর ফুলবানুর মারামারি চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে।। এবার বড় মামা নিজেই দৌড়ে চলে গেলেন ভিতরে পিছে পিছে আম্মু আব্বু মামী প্রায় সবাই গেলো।। আমি শুরু মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছি, ভিতরে কি হচ্ছে ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখে বেশ মজা পাচ্ছি।। মামা ভিতরে ঢুকেই আগে আদিলকে টেনে ধরলেন, আর ফুলবানুকে মামী আম্মু মিলে ধরে রাখলো।। দুজন সমানে ছুটার চেস্টা করছে, মনে হচ্ছে আজ খুন খারাপি হয়ে যাবে।। আমার ছোট মামা মামী শুধু তামাশা দেখে যাচ্ছে, মামা আদিলকে টেনে টুনে রুম থেকে বের করে নিয়ে এলো।। আদিল কিছুতেই রুম থেকে বেরুবে না, তার এক কথা তার বিছানায় এই মেয়ে কেন শুবে।। আর ফুলবানু হঠাৎ এক বিশ্রী কান্ড করে বসলো, সে সোজা মামীর হাতে একটা কামড় বসিয়ে দিলো।। মামী ওরে মা গো, বলে চিৎকার দিয়ে ফুলবানুর গালে একটা চড় লাগিয়ে দিলো।। এইবার ফুলবানু পুরা দেশি গালিগালাজ করছে, খিস্তি খেঁওর যাকে বলে আর কি।। ছোট মামী দৌড়েো ঘর থেকে বের হয়ে গেলো, আমার ধারণা ফুলবানুর বোন বা নানীকে আনতে যাচ্ছে।।

আমার ধারণাই ঠিক খানিক বাদে তারাবানু আর তাদের নানী ঢুকলো।। আমি রুমের এক কোণায় বসে আছি।। মূল দরজা দিয়ে ঢুকে বামে ঘরের এক সাইডে আমি বসা।। আর ডানেই ওই বাসর ঘরের দরজা!! হন্তদন্ত হয়ে উনারা দুইজন ওই রুমে ঢুকলো, আমি একবার বাস্তবে তাকিয়ে দেখি একবার তাকাই মনিটরে, অন্যরকম এক অবস্থা।। প্রায় বেশ অনেক্ষণ পরে সিদ্ধান্ত হলো, আদিল এই বিছানায় ঘুমাবে আর ফুলবানু তার নানী আর ছোট বোনের সাথে অন্য ঘরে ঘুমাবে।। আমি আফসোস করতে থাকলাম, পুরা প্লানটাই মাটি।। ভাবছিলাম কত কি হবে, মজা পাবো কিন্তু হলো না কিছুই।। সেদিনের মতই এভাবেই আদিলের বাসর রাত সমাপ্ত হলো।।

আরো দিন দুয়েক পর, আমরা ঢাকা ফিরে আসলাম।। এরমধ্যে আদিল আর ফুলবানু এভাবেই আলাদা আলাদা শুয়েছে, এরা কেউ কাউকে দুইচোখে দেখতে পারে না।। আমার সাথে তারাবানুর বেশ ভাব জমে গেছে, আমরা একটু পর পর ফোনে কথা বলি।। আম্মু ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছে কিছুটা, আমি ভয়ে আছি ঢাকায় গিয়ে প্যাদানি না দিলেই হয়।। আমি মনে মনে ভাবলাম, আম্মু কিছু জিজ্ঞেস করলে ধুয়ে মুছে না করবো, দেখা যাক কি হয়!!

মাস দুয়েক পরে, আচমকা একদিন বড় মামা আমাদের বাসায় মিষ্টি নিয়ে হাজির!! কি এক ব্যবসায়িক কাজে ঢাকা এসেছে, সেখান থেকেই আমাদের বাসায় আগমন।। আর মিষ্টি আনার কারণ অবশ্য অন্যটা, আদিলের বউয়ের নাকি বাচ্চা হবে।। সে গর্ভবতী হয়ে গেছে।। মোবাইলে এই খবর আম্মুকে আরো আগেই দিয়েছে, এবার আবার সরাসরি জানাতে চলে এসেছে।।
মামা একদিন আমাদের বাসায় থেকে আবার চলে যাবে, আমার তখন অবসর ছিলো, আম্মুকে বললাম- আমিও মামার সাথে টাংগাইল যাই, তিন চারদিন থেকে চলে আসবো।। আম্মু শুরুতে আপত্তি করলেও পরে রাজী হয়ে গেলো।। আসলে আমার মূল উদ্দেশ্য হলো, তারাবানুর সাথে দেখা করা।। মেয়েটার সাথে আমার প্রেম জমে ক্ষীর হয়ে গেছে।। তারাবানুর নাম বদলে আমি স্টার রেখে দিয়েছি, তাকে আমি স্টার বলে ডাকি।। তারাবানুর নাকি বেশির ভাগ সময় আমাদের মামা বাড়িতেই থাকে।। সে বই খাতা জামা কাপড় নিয়ে এসেছে।। এবার এমন সুযোগ তো আর মিস করা যাবে না।। স্টার অনেক দিন থেকেই আমাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছে, কিন্তু সে বলেছে- ফোনে বা ফেসবুকে বলবে না।। দেখা হলে নাকি বলবে।। আমি তাই সব ভেবে ভেবে মামার সাথে টাংগাইল যাওয়াকে আমার গোল্ডেন চান্স মনে করলাম!!

সন্ধ্যা নাগাদ মামার সাথে বাড়িতে এসে পৌঁছালাম, এসেই ছোট মামা মামী, মামাতো বোন সহ সবার সাথে আগে দেখা করলাম।। তারাবানু এর মধ্যে কয়েকবার আমার সামনে দিয়ে পায়চারী করেছে।। কিন্তু এখনো কথা বলার সুযোগ হয়ে উঠে নি।।

একটা ব্যাপার এখানে আসার পর থেকেই খটকা লাগছে!! মামা বাড়িটা কেমন যেনো অচেনা লাগছে।। মনে হচ্ছে কি যেনো অনেকটা বদলে গেছে।। আদিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হলেও সে খুব চঞ্চল ছিলো, হাত পা নাড়িয়ে কত কথা বলতো, আমাকে আসতে দেখলে সে অনেক খুশি হতো।। কিন্তু এখন কেমন যেনো চুপচাপ হয়ে গেছে।। সে কি দেখে যেনো ভয় পায় এমন লাগে।। আমি শুরুতে এসবে নজর দেই নি, একদিন যাবার পর থেকে আমার কাছে মামাবাড়ির পরিবেশে এক অদ্ভুত পরিবর্তন মনে হচ্ছে!! স্টারের সাথে কথা বলার সুযোগ পেলাম, আজ বিকেলে- আমরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে চলে যাচ্ছি।। যেহেতু এই গ্রামের সবাই কমবেশি আমাকে চিনে, আর স্টার এই ক’দিন এখানে থাকাতে ওকেও সবাই চিনে ফেলেছে তাই সমস্যা নেই।।

আমরা কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে ভালো মন্দ নিয়ে কথা বললাম, এক ফাঁকে স্টার আমাকে জানানো- জানো শোভন, ফুলির পেটের বাচ্চা কিন্তু আদিল ভাইয়ের না??

আমি যেনো হাঁটতে গিয়ে বড় একটা ধাক্কা খেলাম, উত্তেজিত কন্ঠে বললাম- মানে কি? কি বলো? কার বাচ্চা?

……
চলবে-

…………

 

2nd Epeisod 

© রাজভী রায়হান শোভন ( Razvi Rayhun Shovon )

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Alert: Content is protected !!
Close
Close